ড. মুহাম্মদ ইউনুস: কঠিন সময়ে দেশের নেতৃত্ব ও জনমানুষের আস্থা
৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর যখন দেশ গভীর সংকটের মুখে পড়েছিল, তথাকথিত রাজনৈতিক শৃঙ্খলা টলিয়ে স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় সামাজিক আন্দোলন বাংলাদেশে গড়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে দেশের নেতাদের মধ্যে জনগণের বিশ্বাস সবচেয়ে বেশি ছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুস-এর প্রতি। আন্দোলনের নেতা-সমর্থকরা তাঁকে সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তাব করেন, এবং শুরুটা হয় সেই প্রত্যাশার আলোয়।
অবশেষে ড. ইউনুস ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের হাতে। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে অপ্রত্যাশিত ও ব্যতিক্রমধর্মী একটি ঘটনা — কারণ তিনি কখনো ধ্রুব রাজনৈতিক ব্যক্তি নন, বরঞ্চ তিনি একটি মানবিক ও সমাজবান্ধব নেতৃত্ব টীকায় পরিণত হয়েছিলেন।
তিনি দায়িত্ব গ্রহণের সময় নিজ অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন যে তিনি ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ থেকে নয়, বরং “জনগণের ইচ্ছা এবং দেশের পরিবর্তনের দাবি” মেনে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বারবার অনুরোধ জানিয়েছেন যে তার কাজটি একটি সময়োপযোগী দায়িত্ব যা দেশের জন্য প্রয়োজন ছিল।
ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল বাড়তি রাজনৈতিক বিভাজন কাটিয়ে দেশের শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, আইন-শৃঙ্খলা ঠিক রাখা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় শক্তিশালী করা, এবং অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। এই কাজগুলো দেশের জনগণের কাছে ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশা ও দাবির কেন্দ্রবিন্দু।
যদিও দায়িত্ব নেওয়ার পর নানা রাজনৈতিক চাপ, সমালোচনা এবং পরিস্থিতির জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তবুও ড. ইউনুসের সরকারের অধীনে দেশে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছে। আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের সংবিধান ও আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এবং একে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে পরিচালনার জন্য যথেষ্ট কাজ করা হয়েছে।
জনগণের মনে ড. ইউনুসের প্রতি যে চরম শ্রদ্ধা গড়ে উঠেছে, তার পেছনে তার অবদানের ইতিহাস, মানবিক চেতনা ও দেশপ্রেম অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। তিনি বিশ্বব্যাপী গ্রামীণ ব্যাংক এবং মাইক্রোক্রেডিট মডেলের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের ক্ষমতায়নের কাজ করে গেছেন, যা তাকে “পিপলস ব্যাংকার” হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই কারণে মানুষ এখন তাঁকে শুধু একজন প্রশাসনিক প্রধান হিসেবেই নয়, বরং দেশের পরিবর্তনের প্রতীক ও নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবেও মনে করছে।
তবে ড. ইউনুস নিজেও বারবার বলেছেন যে দায়িত্বটি গ্রহণ করেছেন নেতৃত্বের জন্য নয়, বরং দায়িত্ব পালন করার জন্য। তিনি উল্লেখ করেছেন যে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হলে তিনি কোনো সরকারি পদে থাকবেন না, এবং নতুন নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর করছেন।
এমনকি মানুষের মধ্যে একটি অংশের মতামতও এসেছে যে “ড. ইউনুস যদি দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকেন, তাহলে বাংলাদেশ আরও উন্নত, ন্যায়সঙ্গত ও মানবিক সমাজের দিকে এগিয়ে যাবে।” অনেকের মতে, তার নিরাপত্তা, সততা ও জনবান্ধব নীতিগুলো তাকে রাষ্ট্রীয় কোন শীর্ষ দায়িত্বে দেখতে চান। যদিও তিনি নিজে তা প্রত্যাশা করেন নাই , তবুও জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসা তাকে আজ এক বিশেষ মানুষের মর্যাদায় পদার্পন করেছে।
অবশ্যই, তার নেতৃত্বে যাওয়া দিনগুলোতে ছিলো অনেক সমালোচনা উত্তরোত্তর আলোচনা ,সবই লেগে আছে। কিন্তু ব্যাপারটি অনস্বীকার্য যে ড. মুহাম্মদ ইউনুস দেশের বর্তমান সংকটের সময়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেই দায়িত্ববোধ দিয়ে, যা অনেকেই সরকারের অন্যান্য যেকোনো ব্যক্তির মধ্যে খুঁজে পায়নি।










