শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
বাস্তবতা বনাম আত্মপ্রবঞ্চনা: পঞ্চাশের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান, বিভ্রান্তি ও ক্ষমতার নাটক গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে খেলাফত মজলিসের বিক্ষোভ ও সমাবেশ ঘোষণা জোনায়েদ সাকির পদত্যাগ, গণসংহতির ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী নীলু দুপুরের প্রখর রৌদ্রে ৩ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পেলেন মাত্র ২০০ টাকার তেল আমার সফর নিয়ে যে সংবাদটি ছড়িয়েছে, তা বিদেশি একটি প্রতিবেদনের ভুল ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা। মির্জা আব্বাসের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ নয়, ইনফেকশন হয়েছে-ডা. শাহাবুদ্দিন তালুকদার একাধিক চ্যালেঞ্জে অর্থনীতি মানিকগঞ্জে বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতার মায়ের স্মরণে দোয়া মাহফিল ১৫ হাজার মানুষের ইফতার ইমাম-পুরোহিতদের সম্মানি কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী ইরানি মিডিয়ার দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নেতানিয়াহু নিহত

বাস্তবতা বনাম আত্মপ্রবঞ্চনা: পঞ্চাশের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের উত্থান, বিভ্রান্তি ও ক্ষমতার নাটক

Abdullah Al Jahid
Update : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

পঞ্চাশ বছর বয়সে পৌঁছে Donald Trump যেন নিজেই নিজের তৈরি এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন—যেখানে তিনি একই সঙ্গে নায়ক, বর্ণনাকারী, এবং কখনো কখনো নিজের গল্পের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য চরিত্র। তাঁর জীবনের এই অধ্যায়টি কেবল একজন ব্যবসায়ীর গল্প নয়; এটি এমন এক মানুষের কাহিনি, যিনি বাস্তবতা ও নিজের কল্পিত সাফল্যের মাঝখানে এক অদ্ভুত সেতু তৈরি করে চলেছেন।

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্পের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য বাইরে থেকে যতটা ঝলমলে দেখাত, ভেতরে ততটাই ছিল নড়বড়ে। আটলান্টিক সিটির ক্যাসিনোগুলো—যেগুলো একসময় তাঁর সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হতো—ধীরে ধীরে ঋণের বোঝায় ভেঙে পড়ছিল। বিশাল ঋণ, ব্যর্থ প্রকল্প, আর অর্থনৈতিক চাপে তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে উঠছিল। কিন্তু এই বাস্তবতা কখনোই তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়নি।

বরং, তিনি এমন এক কৌশল বেছে নিলেন, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়—তিনি নিজের ব্যর্থতাকেও সাফল্যের গল্প হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। সংবাদমাধ্যমে তাঁর উপস্থিতি, নিজের নামকে ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, এবং আত্মবিশ্বাসী—অনেকের মতে অতিরঞ্জিত—বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি এমন এক চিত্র তৈরি করেন, যেখানে ব্যর্থতা যেন অস্তিত্বই রাখে না।

এই সময়টিতে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে তাঁর নিজের প্রতি অদম্য বিশ্বাস—বা সমালোচকদের ভাষায়, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এক আত্মবিশ্বাস। তিনি এমনভাবে কথা বলতেন, যেন তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, যদিও বাস্তব পরিস্থিতি ছিল অনেক বেশি জটিল।

২০০০-এর দশকে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প বুঝতে পারেন, কেবল ব্যবসা দিয়ে নয়—জনমত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেও ক্ষমতা অর্জন করা যায়। এই উপলব্ধিই তাঁকে নিয়ে আসে টেলিভিশনের পর্দায়। The Apprentice–এ তাঁর উপস্থিতি ছিল একটি মোড় ঘোরানো ঘটনা।

এই শো-তে তিনি নিজেকে এমন এক সফল, দৃঢ়চেতা ব্যবসায়ী হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং অন্যদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারেন। “You’re fired”—এই একটি বাক্য তাঁকে কোটি মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—এটি ছিল একটি নির্মিত বাস্তবতা, একটি সাজানো মঞ্চ, যেখানে ট্রাম্প ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র।

অনেক সমালোচকের মতে, এই শো-ই ট্রাম্পকে এমন এক আত্ম-ছবিতে বিশ্বাস করতে সাহায্য করে, যা বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি বড়, অনেক বেশি শক্তিশালী। তিনি যেন ধীরে ধীরে নিজের তৈরি চরিত্রটিকেই বাস্তব বলে মেনে নিতে শুরু করেন।

এই সময় থেকেই তাঁর বক্তব্যে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হতে থাকে—তিনি প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজেকে “সেরা”, “সবচেয়ে সফল”, “সবচেয়ে জ্ঞানী” হিসেবে উপস্থাপন করেন। অর্থনীতি থেকে রাজনীতি, মিডিয়া থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সব বিষয়ে তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল সীমাহীন। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের পেছনে কতটা বাস্তব জ্ঞান ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল সবসময়ই।

২০১৫ সালে তিনি যখন ঘোষণা দেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেবেন, তখন অনেকেই এটিকে আরেকটি প্রচারণা কৌশল হিসেবে দেখেছিলেন। কারণ তাঁর বক্তব্য প্রায়ই ছিল অসংলগ্ন, কখনো কখনো তথ্যভিত্তিক নয়, এবং অনেক ক্ষেত্রে বিতর্ক উসকে দেওয়ার মতো।

কিন্তু এখানেই ট্রাম্পের বিশেষত্ব—তিনি বুঝেছিলেন, আধুনিক রাজনীতিতে মনোযোগই সবচেয়ে বড় শক্তি। এবং তিনি সেই মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হন—ভালো হোক বা খারাপ, তিনি সবসময় আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন।

২০১৬ সালের নির্বাচন ছিল এক নাটকীয় অধ্যায়। Hillary Clinton–এর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তাঁর জয় প্রমাণ করে, জনমত গঠনের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম সবসময় কার্যকর হয় না। তিনি এমন এক ভোটারগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করেন, যারা নিজেদের দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত মনে করছিল।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সময়কাল শুরু থেকেই ছিল বিতর্কে ভরা। তাঁর সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই ছিল আকস্মিক, কখনো কখনো পরামর্শ উপেক্ষা করে নেওয়া। তিনি বিশেষজ্ঞদের মতামতকে প্রায়ই চ্যালেঞ্জ করতেন, এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেকে তাঁদের চেয়েও বেশি জ্ঞানী হিসেবে উপস্থাপন করতেন।

এই আচরণ তাঁর সমর্থকদের কাছে ছিল সাহসিকতা—একজন নেতা, যিনি “সিস্টেম”-এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু সমালোচকদের কাছে এটি ছিল এক ধরনের অজ্ঞতা, যেখানে জটিল বিষয়গুলোকে সরলীকরণ করে দেখা হয়।

২০২০ সালে COVID-19 মহামারি এই দ্বৈত চিত্রকে আরও তীব্র করে তোলে। একদিকে তিনি পরিস্থিতিকে হালকা করে দেখানোর চেষ্টা করেন, অন্যদিকে নিজেকে সংকট মোকাবিলায় সফল নেতা হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর বক্তব্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এই ফাঁক অনেকের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নির্বাচনে Joe Biden–এর কাছে পরাজয়ের পরও ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল পূর্বের ধারাবাহিকতারই অংশ। তিনি ফলাফল মেনে নিতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং নিজের বর্ণনাকেই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যান।

পঞ্চাশের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ট্রাম্পের গল্প তাই এক ধরনের ধারাবাহিকতা বহন করে—একজন মানুষ, যিনি নিজের তৈরি বাস্তবতায় অটল বিশ্বাস রাখেন, এবং সেই বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই নিজের পরিচয় নির্মাণ করেন। তাঁর সমালোচকরা তাঁকে প্রায়ই বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন, আত্মমুগ্ধ এবং অদক্ষ হিসেবে দেখেন; অন্যদিকে তাঁর সমর্থকরা তাঁকে দেখেন সাহসী, ভিন্নধর্মী এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়ানো একজন নেতা হিসেবে।

এই বৈপরীত্যই ট্রাম্পকে একটি জটিল ও আকর্ষণীয় চরিত্রে পরিণত করেছে। তিনি একাধারে সফল এবং বিতর্কিত, প্রভাবশালী এবং বিভাজনমূলক—একজন মানুষ, যাঁকে বোঝা সহজ নয়, কিন্তু উপেক্ষা করাও অসম্ভব।

এই গল্প এখানেই শেষ নয়। বরং এখান থেকেই শুরু হয় আরও নাটকীয় এক অধ্যায়—যেখানে ক্ষমতা হারানোর পরও প্রভাব ধরে রাখার লড়াই, এবং নিজের নির্মিত বাস্তবতাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চলবে…


More News Of This Category

ফেজবুকে আমরা

এক ক্লিকে বিভাগের খবর